আধখানা ভালো ছেলে আধা মস্তান

‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মস্তান’ ‘তোমার জন্য’, ‘মাঝে মাঝে তবো দেখা পাই’, ‘হারিয়ে গিয়েছি’, ‘হোক কলরব’, ‘সে যে বসে আছে’ – এই গানগুলো কানে বাজার সঙ্গে সঙ্গে যে মানুষেটা চেহারা ভেসে ওঠে কল্পনায় তিনি শায়ান চৌধুরী অর্ণব। অর্ণবের গান আমার, শৈশবে রাত জাগার সঙ্গী, কৈশোরের একাকিত্বের সঙ্গী, মন খারাপের সঙ্গী, অর্ণবের ক্রিয়েশনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে শৈশবে। বাটন ফোনে দিয়ে শুনতে থাকা গানগুলোর সঙ্গে হাজারো স্মৃতি জর্জরিত। মজার বিষয়টা হচ্ছে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমি জানতাম না শিল্পী অর্ণব দেখতে কেমন? কেননা আমি শুধু গান ও-ই শুনেছি।

আমার কল্পনার জগতে অর্ণব ছিল এক রোম্যান্টিক

শিল্পীর স্বার্থকতা এটাই তিনি শ্রোতাদের মাঝে জীবন্ত থাকেন তার সৃষ্টি দিয়ে। আমার কল্পনার জগতে অর্ণব ছিল এক রোম্যান্টিক শিল্পী। শৈশবে আমার মনের মধ্যে চলতে থাকা রোমান্টিকতা গুলো গানের লিরিকে বলে দিতেন পারতেন। একজন শিল্পীর সার্থকতা তার সময় কে ধরতে পারা আর অর্ণব তা করিয়ে দেখিয়েছে তার সৃষ্টি গানগুলো দিয়ে। বড় হওয়ার পর প্রথম তার ছবি দেখলাম গুগলে। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছে এই মানুষটা খানিকটা এলোমেলো। অর্ণব কে নিয়ে নির্মিত মিউজিক্যাল ফিল্ম দেখে আমার ভাবনা সত্যি হয়েছে। তিনি আসলেই অনেকটা অগোছালো।

masthan

মার্ভেলকে ঘিরে আবর্তিত অরিজিন মুভি

অর্ণবের কনসার্টে গাওয়া গানের ভিডিও দেখে প্রায় সোশ্যাল মিডিয়া তে চোখ আটকে যেতো। অনান্য শিল্পীরা কনসার্টে স্টেজে দাঁড়িয়ে গান গায় সেখানে অর্ণব কে দেখতাম শ্রোতাদের মাঝখানে গিটার হাতে নিয়েই গান শোনাচ্ছে। শ্রোতারা গলা মিলিয়ে সেগুলো গেয়ে যাচ্ছে। আমি চুপিসারে সেগুলো দেখে যেতাম আর ভাবতাম শিল্পী হলেই তো লাভ কনসার্টে গান গাওয়া লাগে না শুধু গলা মিলিয়ে গেলেই হয়। বাকিটা তো অডিয়েন্স ও গেয়ে ফেলে। আমার এই ভাবনাটা ভুল হয় ২০২১ সালে ২রা ফেব্রুয়ারি। শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছিলেন অর্ণব। গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

হঠাৎ করে সকল প্রতিযোগি অডিটোরিয়ামের সিট থেকে নেমে বসে পড়লো মাটিতে। অর্ণব চলে আসলেন মাঝখানে। অর্ণবের গান শুরু হলো আর সকলে চিরচেনা গানগুলো তে গলা মিলাতে শুরু করলো। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম গানে আলাদা একটা শক্তি আছে যেটা শতশত মানুষ এক করে ফেলতে পারে মূহুর্তের মধ্যে। অর্ণব কে নিয়ে আমার ফেসিনেশন বহুকাল আগে থেকেই। ভক্তরা গভীর থেকে জানার সুযোগ পেয়েছে কাল। অর্ণবকে নিয়ে ৭০ মিনিটের মিউজিক্যাল চলচ্চিত্র ‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মস্তান’ বানিয়েছেন আবরার আতহার।

ছবিতে অর্ণবের গাওয়া জনপ্রিয়

‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মস্তান’ ছবিতে অর্ণবের গাওয়া জনপ্রিয় ১২টি গানের নতুন সংগীতায়োজন দেখতে পাচ্ছে দর্শক। ফিল্ম টিতে অর্ণবের পছন্দ, অর্ণবের পরিবার, অর্ণবের শৈশব-কৈশোর গল্প, বাবা-মায়ের স্মৃতিচারণ, অর্ণব এন্ড ফ্রেন্ডসের গল্প গুলো তুলে ধরা হয়৷ সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়টা হচ্ছে গানের পেছনের গল্প গুলো শুনতে পারা শিল্পীর মুখ থেকেই। কক্সবাজারের সমুদ্রে এর পারে বসেই বেশিরভাগ স্মৃতিচারণ করেছে অর্ণব। ফিল্মে সূচনা হয় ‘চাইনা ভাবিস’ গান দিয়ে আর সমাপ্তি ঘটে ‘আধখানা’ গানের মাধ্যমে। ১২টি গানের মধ্যে নিজের দশটি মৌলিক গান গেয়েছেন অর্ণব।

এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ এবং আব্বাসউদ্দিনের ‘হাড় কালা’ গেয়েছেন তিনি। প্রতিটি গান এ অর্ণবের সঙ্গে বাজিয়েছে তাঁর অর্ণব অ্যান্ড ফ্রেন্ডস গানের দলের সদস্যরা। এছাড়া ৬টি সুনিধির উপস্থিতি ছিলো৷ গানের সেটআপটা সাজানো হয়েছে বেশ নানন্দিকভাবেব। এছাড়া পর্দায় এক ঝলক দেখা যায় গাউসুল আলম শাওন এবং নির্মাতা পিপলু আর খান কে। মিউজিক্যাল ফিল্ম ‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মস্তান’ নির্মাণের কারিগর আবরার আতহার। অর্ণবের সঙ্গে আবরারের বন্ধুত্বও বহুদিনের। অর্ণব ও আবরারের চেনাজানা শৈশব-কৈশোরের সময় থেকেই।

অর্ণবের মা সুরাইয়া চৌধুরীর ও আবরারের মা পুরনো বন্ধু। অর্ণবের সঙ্গে আবরারের স্ত্রী আনিরের বন্ধুত্বটা সেই কৈশোর থেকে। অর্ণবকে কাছ দেখার সুযোগ হয়েছে নির্মাতার। সে ছাপ ছিলো নির্মাণের মধ্যে। খুবই নিখুঁত ভাবে উপস্থাপন করেছেন সকল বিষয়গুলো। অর্ণবের ‘আধখানা’ গানের লাইন থেকেই ‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মস্তান’ নামটি বাছাই করেছেন নির্মাতা। ভিন্নধর্মী নির্মাণের জন্য সকলের কাছে পরিচিত এক নাম আবরার আতহার। বিজ্ঞাপন, নাটক কিংবা ওয়েবফিল্ম সবখানেই ভিন্নতার ছোঁয়া থাকে। নির্মাতা হিসেবে ‘লাইফ ইন আদার ওয়ার্ডস’ নামের একটি শর্টফিল্ম আবরার আতহারকে আলোচনায় নিয়ে আসে৷

পরবর্তীতে বায়োস্কোপে প্রচারিত

পরবর্তীতে বায়োস্কোপে প্রচারিত টেলিফিল্ম ‘কলি ২.০’ তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তবে ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভের প্রথম বাংলাদেশী কনটেন্ট ‘মাইনকার চিপায়’ তাকে নির্মাতা হিসেবে সর্ব মহলে পরিচিত এনে দেয়। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ২০১৫ সালের এপ্রিলে নিজের ষষ্ঠ একক অ্যালবাম ‘খুব ডুব’ প্রকাশের পর হুট করেই গানের ভুবন থেকে ডুব দিয়েছিলেন সংগীতশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণব। অডিও, ভিডিও, সিনেমা কোথাও না শিল্পী অর্ণব। বন্ধুদের সঙ্গে মঞ্চে-টিভিতে সচরাচর পাওয়া গেলে সেখানেও নেই। শেষ তার উল্লেখযোগ্য কাজ ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার ‘এই শহর আমার’।

টাইম ট্রাভেল নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান সেরা একটি

পত্রিকার পাতায় প্রায় শিরোনাম দেখতাম অর্ণব কই? কেন এই অসময় ডুব? কেন অনিয়মিত অর্ণব? কিন্তু তার ডুবে থাকার পিছনে রয়েছে একটা গল্প। সে গল্পটাই জানতে পেলাম মিউজিক্যাল ফিল্ম দেখার পর। অর্ণব এবং সুনিধি দুজন ভালো বন্ধু। দুজনের পরিচয় তারা দুজন দুজনার জীবনসঙ্গী। জীবনে একটা সাহস দেয়ার মানুষ থাকা লাগে আর অর্ণবের জীবনে এখন সাহস দেওয়ার মানুষটা হচ্ছে সুনিধি তা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে চলচ্চিত্রের শেষ অংশে। মিউজিকের আলাদা একটা আলৌকিক শক্তি আছে।

মন ভালো করে দেওয়ার শক্তি, মন খারাপ করে দেওয়ার শক্তি, স্মৃতি কে মনে করিয়ে দেওয়ার শক্তি, শতশত মানুষ কে এক সূত্র তে আটকে ফেলার শক্তি রয়েছে সংগীতে। কিন্তু এই সংগীত গুলো যাদের নিখুঁত পরিচর্যায় তৈরি হয় তাদের জীবনের শক্তিটা কি? তাদের গানের মতোই কি জীবনটাও সুন্দর। নাকি রয়েছে অনেক দুঃখ-কষ্ট। শিল্পীর জীবনে অজানা গল্প আমাদের জানার সুযোগ হয়না। শিল্পী অর্ণবের ক্রিয়েশনের পিছনের গল্প গুলোই তুলে ধরেছেন নির্মাতা। মিউজিশিয়ান হয়ে উঠার পিছনে নানান স্ট্রাগল।

স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে

স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে থাকা এক শিল্পীর গল্প জানার জন্য দেখুন আধখানা ভালো ছেলে, আধা মস্তান……. ক্রিস্টি ব্রাউন “Cerebral Palsy” নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত। যার ফলে সে হাটতে এবং কথা বলতে অক্ষম। সে তার শরীরের শুধু মাত্র বাম পা কে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তার পরিবার তাকে খুব ভালোবাসে এবং সাহায্য করে। বিশেষ করে তার মা। সে তার বাম পা ব্যবহার করে ফুটবল খেলে, চক দিয়ে লেখালেখি করে, ছবি আকার চেষ্টা করে। ড. আইলিন কোল নামক ডাক্তার ক্রিস্টি কে থেরাপি দেওয়ার মাধ্যমে কথা বলা শেখানোর চেষ্টা করেন।

ফ্যামিলি এবং নিজের ব্যক্তিগত অসুবিধা গুলোকে নিয়েই ক্রিস্টি ব্রাউনের জীবন। শুরুর আধঘন্টা ড্যানিয়েল ডে লুইসের অভিনয় দেখে ইমোশনাল হয়ে গিয়ে ছিলাম। তার প্রথম অস্কার জয়ী পারফরম্যান্স ছিলো।অবশ্য বাকি অংশেও ইমোশনাল দৃশ্য আছে তার সাথে কমেডি ও রয়েছে। কোনো কিছুই মানুষ কে দমিয়ে রাখতে পারে না এই মুভি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *