ক্লিন্ট ইস্টউডের পারসোনাল একটা সিনেমা

ক্রাই মাচো’কে  বলবো। না, এই কারণে নয় যে, এটা তার নিজস্ব ধারণা কিংবা বিশ্বাস’কে প্রতিফলিত করেছে। বলছি কারণ, এই সিনেমাটাই ক্লিন্ট ইস্টউড কিংবা ক্লিন্ট ইস্টউডই এই সিনেমা। একজন বৃদ্ধ কাউবয়, তার একসময়কার বসের অনুরোধ রাখবে বলে, মেক্সিকো যায়। বসের ছেলেকে উদ্ধার করে আনতে, অত্যাচারী মায়ের কাছ থেকে। পরের গল্প তাদের পথের। পথ চলতে চলতে কিছু ঘটনা, কিছু অতীত অনুশোচনা, কিছু বিপদ আর কিছু উষ্ণ মুহূর্তের গল্প।

সেটাকেই শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে রূপায়িত একটি চরিত্র

প্রিমাইজ থেকেই বোঝা যায়, এই চরিত্র ক্লিন্ট ইস্টউডেরই হতে বাধ্য। চলচ্চিত্রের পর্দায়, তার যেই ‘ফিগার’/’পারসোনা’, সেটাকেই শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে রূপায়িত একটি চরিত্র। তবে সাথে বাস্তবজীবনের ইস্টউডকেও পাওয়া যাবে। কেনই বা না? সিনেমাটা যে তার জীবনের সাথে নিগমবদ্ধ। লোকটার বয়স তো ছুঁলো ৯১। ৬ দশক ধরে বিস্তৃত ক্যারিয়ার এখনো থামেনি। চলছে। তবে বয়সের ভারে চামড়ায় তো টান পড়েছে। চলনবলনে স্থবিরতা এসেছে। কথার ফাঁকেফাঁকে দমটা নিতে সময়ও লাগে একটু বেশি। সেই ইস্টউডকেই এখানে পাওয়া যায়। সিনেমায় একটা সংলাপ আছে এমন, “এই ‘মাচো’ ব্যাপারটা আসলে ওভাররেটেড।

fefdxfsdf

একটি সাইকোলজিক্যাল হরর থ্রিলার মুভি

এটা দিয়ে মানুষ শুধু দেখাতে চায় যে, তার দৃঢ়তা আছে। শক্তিসামর্থ্য আছে। এইটুকু নিয়েই তারা শ্রান্ত হয়। এটা জীবনের অন্যসবকিছুর মতোই, অসম্পূর্ণ; অমীমাংসিত। তুমি মনে করছো, তুমি জীবনের সব উত্তর পেয়ে গেছো। কিন্তু বয়স বাড়তে বাড়তে তুমি বুঝতে পারো, ওসবের কিছুই তোমার নেই। কিছুই তুমি বুঝোনি।” এই সংলাপটা যেন, ওয়েস্টার্নের সেই ৭০-এর পৌরুষে টগবগ করা; কাউবয় হ্যাটের নীচে ঝিলকে থাকা তীক্ষ্ণ চোখ; শক্ত চোয়াল আর সেকেন্ডের চাইতেও দ্রুত বন্দুকবাজি দেখানো ইস্টউডকে, ৯১ বছরের বৃদ্ধ এবং বয়সের সাথে বিজ্ঞ হওয়া ইস্টউডের বলা অভিজ্ঞতালব্ধ কথা।

ঠিক সেই দৃশ্যেই, ফোর্থওয়াল ব্রেক না করেও ওমন একটি মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে যায় এই সিনেমা। আরো ছোট ছোট সংলাপে, দৃশ্যে সেটার উপস্থিতি আছে। ‘ক্রাই মাচো’র এই গল্প, গল্পের বিভঙ্গ খুবই সহজ সাধারণ। এতে কোন অমোঘ জটিলতা নেই, অভিঘাতী দ্বন্দ্ব নেই। এতে ঘটে না তেমন কিছুই। হয়তো ৯১ বছরের বুড়ো’টা কোনরকম নাটকীয়তায় আর যেতে চান না। কাঁধের উপর ভারটা সহজ চান, বয়সের কারণেই। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছা আছে, যুবক বয়সের সেই পশ্চিমে যাবার। বুনো পশ্চিমে। রুক্ষতায় ভরা পশ্চিমে। তবে বয়সের বাঁধনে রুক্ষতাকে আর কাছে টানা সম্ভব নয়।

তাই দেখতে চাইলেন, সরল করে

শান্তসৌম্য এক পশ্চিমকে। হ্যা, কিছু খারাপ লোক তো থাকবেই। খারাপ একটা বৃত্ত তো রাখতেই হয় সিনেম্যাটিক করে তোলার প্রয়োজনে। তবে ওগুলোকে যতখানি নূন্যোক্ত কিংবা আড়াল করা যায়, ততখানি করে। রেস্টুরেন্টের সেই পরিবারটার সাথে তৈরি হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু সুন্দর একটা সম্পর্কের দিকেই বেশি সময় থাকতে চাইলেন। তেমন কিছু না ঘটলেও, দেখতে ভালো লাগে সেই মুহূর্তগুলো। স্মিগ্ধতা, শীতলতায় ভরা। এই পরিবারের মাঝ দিয়ে ঈশ্বরহীন পশ্চিমের একটা নতুন চিত্রপট যেন আঁকার চেষ্টা করলেন।

সম্পর্ক, পরিবার, ঈশ্বর; সবটার উপস্থিতিই আছে পশ্চিমের ওই ছোট্ট শহরে। কিংবা বলতে হয়, পশ্চিমের ওই ছোট্ট রূপকথার শহরে। শেষ অব্দি, সেখানেই ফিরেছিল মাইক মিলস। ওইযে, আগেই একবার বললাম, এখানে তেমন কিছু ঘটে না। তবে তা সত্ত্বেও, সিনেমায় জড়িয়ে থাকা সেন্টিমেন্টাল দিকটাই একে এগিয়ে নিয়ে যায়। ক্লিন্ট ইস্টউডের চলাফেরায় ধীরতা আসলেও, মাথাটা এখনো দ্রুতগতিতেই চলছে। তার ফিল্মমেকিং দক্ষতা সেই কথাই বলে। প্রত্যেকটা ব্লকিং, প্রত্যেকটা কম্পোজিশনেই যথাযথ পরিকল্পনার ছাপ আছে। ক্যামেরায় ল্যান্ডস্কেপ তুলেছেন নিখুঁতভাবে।

আবহসঙ্গীত করে তোলে নস্টালজিক। টোনের ক্ষেত্রে অবশ্য পুরোটা সময়ই একটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছে এই সিনেমা। তবে এমন অনেককিছুকেই ‘আনসিন’ করে দেওয়া যায় ক্লিন্ট ইস্টউডকে দেখতে গিয়ে। তার উপস্থিতিটা যে চিরকাম্য। লোকটার শরীরী অভিনয় আর বাচিক অভিনয়; দুইটাতেই জড়িয়ে থাকা অপার কমনীয়তা পর্দার সামনে শুধু অনুভব নয়, ধরাছোঁয়াও যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুড়ো’টা যেন আরো ‘ডিয়ারি’ হয়ে উঠছেন। ঠিক একদম আমাদের গ্রামীণ নানুভাই, দাদুভাইদের মতো। পর্দায় দেখতে গিয়ে, সেই শব্দটা হয়তো আনমনে মুখ দিয়ে উচ্চারিতও হয়।

মুভিটির স্পিরিচুয়াল সিকুয়েল

প্রথমেই বলা জরুরি যে Candyman (2021) মুভিটি Candyman (1992) মুভিটির স্পিরিচুয়াল সিকুয়েল। তাই এই মুভিটি পুরোপুরি ভাবে উপভোগ করতে হলে আগের মুভিটি দেখতেই হবে। আগের মুভিটি দেখলে কাহিনীর অন্তর্নিহিত থিমটা সঠিক ভাবে ধরতে এবং অনুভব করতে পারবেন। আমি এই কয়েকদিন আগেই 1992 সালেরটা দেখেছি এবং গতকাল নতুনটা দেখার পর খুবই ভালো লেগেছে মুভিটি। অনেকটা ভিন্ন ধাঁচের একটি হরর থ্রিলার মুভি Candyman যা হররের পাশাপাশি সোস্যাল কমেন্টারি করেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।

q

Candyman (2021) এর কাহিনী Anthony McCoy নামের একজন আর্টিস্টকে নিয়ে যিনি নতুন একটি পেইন্টিং আঁকার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস পেতে পৌঁছে যান Cabrini Green নামের একটি হাউজিং এস্টেটে যেখানে বহুকাল আগে থেকে ব্লাক কমিউনিটির বসবাস ছিলো। তবে এই হাউজিংয়ে লুকিয়ে আছে নানা রহস্য ও ভায়োলেন্ট ইতিহাস যে কারনে সেখানে বর্তমানে আর কেউই বসবাস করে না‌। Anthony McCoy-এর জীবন এরপর সম্পূর্ণ রূপে বদলে যায় যখন এক এক করে রহস্যময় মৃত্যু ঘটতে থাকে তাদের শহরে এবং সেই সাথে একটি সাইলেন্ট উইসপারের মতো শুনা যায় একটিই নাম “Candyman”।

কিন্তু কে এই Candyman ও কি তার উদ্দেশ্য তাই জানতে দেখতে হবে এই চমৎকার মুভিটি। Candyman (1992) মুভিটি আমার বেশ ভালো লেগেছিল। যদিও মাত্র কয়েকদিন আগেই দেখেছি তবে সেখানে যেভাবে রেসিজম ও হোয়াইট সুপ্রিমেসির বিষয় গুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল সেটা আমার খুবই পছন্দ হয়েছিল। এইবারের সিকুয়েলেও সোস্যাল বিষয় গুলো কম সময়ে চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন পরিচালক Nia DaCosta। মুভিটি দেখেই বুঝতে পেরেছি যে তিনি খুব ভালো করে থিমটা বুঝে মুভিটি সাজিয়েছেন।

বেশ কিছু দৃশ্য খুবই অসাধারণ ও সাইলিস্টিক

মুভির বেশ কিছু দৃশ্য খুবই অসাধারণ ও সাইলিস্টিক ভাবে ডিরেক্ট করা হয়েছে। তাছাড়া ন্যারেটিভটা কখনোই এলোমেলোভাবে এগিয়ে যায় না। মুভিতে অপ্রয়োজনীয় একটি দৃশ্যও নেই। মুভিটি দেখতে দেখতে আমার সময়ের দিকে একদমই খেয়াল ছিলো না। রানটাইম মাত্র ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট এবং এনগেজিং একটি কাহিনী হবার কারণে বেশ তাড়াতাড়িই মনে হয় যে মুভিটি শেষ হয়ে গেছে তবে তাই বলে কাহিনীতে কোনো প্রকার অভাব মনে হয়নি। বেশ ফাস্ট পেসড স্টোরি হলেও কাহিনীটি খুবই গভীর তাই বোর ফিল করার কোনো সুযোগই নেই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনাকে কাহিনীটি ধরে রাখতে সক্ষম।

অসচল পরিবারের হালধরতে বেছে নেয়

কাহিনীর মূল চরিত্র Anthony McCoy হিসেবে অভিনয় করেছেন Yahya Abdul-Mateen II। তার অভিনয় এই চরিত্রের জন্য একেবারে পারফেক্ট মনে হয়েছে। ধীরে ধীরে এক অজানা ভয়ের কাছে তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন এমন একটি ইমপ্রেশন তিনি দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার পাশাপাশি তার গার্লফ্রেন্ড Brianna-র চরিত্রে অভিনয় করেছেন Teyonnah Parris। তার অতীতে রয়েছে অনেক ট্রমাটাইজিং অভিজ্ঞতা এবং সেই বিষয়টি তার পার্সোনালিটিতে লক্ষ্য করা যায় সহজেই।

একজন লন্ড্রি ওনার চরিত্রে অভিনয় করেছেন Colman Domingo যিনি ছোটবেলায় Cabrini Green-এ থাকতেন এবং সেখানে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনা গুলো সামনাসামনি দেখেছেন। তার অভিনয় অসাধারণ লেগেছে বিশেষ করে শেষ অংশে। সব মিলিয়ে মুভিটি অসম্ভব এন্টারটেইনিং ও চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। কিছু টুইস্ট আছে যেগুলো একদমই প্রেডিক্টেবল না। বিশেষ করে কাহিনীটি যেভাবে শেষ করা হয়েছে তা অসাধারণ। ভয়ের দৃশ্য অনেক গুলোই রয়েছে তাই দেখার আগে হরর অ্যাসপেক্টটা কনসিডার করেই দেখবেন।

ডায়ালগ গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই মনোযোগ দিয়ে বুঝার চেষ্টা করবেন তাহলেই মুভির আসল মজাটা টের পাবেন। আগের কাহিনীর সাথে যেভাবে নতুন কাহিনীটি মিলানো হয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। দেরি না করে জলদিই দেখে ফেলুন এই চমৎকার মুভিটি। মুভিতে তেমন কোনো অ্যাডাল্ট দৃশ্য নেই কিন্তু অনেক ভায়োলেন্স আছে। মুভিটি যে কোন টরেন্ট সাইটে পেয়ে যাবেন সহজেই। আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *