সত্তর মিনিটের এই ফিল্মে বারোটা গান

মিউজিক্যাল ফিল্ম বলে ঘোষণা দিলেও, সত্তর মিনিটের এই ফিল্মে বারোটা গান বাদেও উপভোগ করার এলিমেন্ট আছে। অর্ণবের জীবন আছে, বেড়ে ওঠা আছে, হোক কলরবের ইস্যুটা আছে, গিটার-পিয়ানোর বাইরে গিয়ে মানুষ অর্ণবকে নতুন করে আবিস্কার করার একটা ব্যাপার আছে। মাত্র সত্তর মিনিটের ফিল্মে বারোটি গান থাকলে খুব কম সময়ই থাকে অন্য কিছু দেখানোর। কিন্তু এখানে সেটিও বেশ মসৃণ। অর্ণব আমার কাছে বেশ ঘোর জাগানো সুরের এক নাম। আমার কাছে মনে হয় অনেকের কাছেই ব্যাপারটা এমন। এই দশক তো বটেই এর আগের দশকের মানুষেরা অর্ণবকে পেয়েছিলেন সক্রিয়।

আগে অর্ণব যখন শান্তিনিকেতনে গেলেন

শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে এসে অর্ণব ছুঁয়েছিলেন আমাদের। তার আগে অর্ণব যখন শান্তিনিকেতনে গেলেন, অবাক বনে গেলেন এখানে ক্লাস হচ্ছে ফাঁকা জায়গায়। তবলা দিয়ে যেমন রবীন্দ্র সঙ্গীত হচ্ছে, আবার অনেক বাচ্চারা নাচতে নাচতেও রবীন্দ্র সঙ্গীত করছে। এরকম অদ্ভুত জায়গা থেকে ফিরে অর্ণব বুঝেছিলেন এখানে রবীন্দ্র সঙ্গীত উপভোগের চর্চা আবার ভিন্ন। এতসম ডায়মেনশনের মধ্যে অর্ণব উঠে এসেছে আমাদের মাঝে। এই গল্পটা আমি জানতাম না। অর্ণবের মুখে শুনলাম একটু আগে, অর্ণবকে নিয়ে মিউজিক্যাল ফিল্ম থেকে।

porimoni

একটি সাইকোলজিক্যাল হরর থ্রিলার মুভি

আরও শুনলাম ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলনে যেভাবে অর্ণবের গানের দুটো শব্দ ‘হোক কলরব’ হয়ে উঠলো শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের বানী। সাধারণের মাঝেও সাধারণ মানুষগুলো আস্তে আস্তে হয়তোবা অসাধারণ হয়ে ওঠে। কিন্তু পুরো জীবনেও ব্যক্তি নিজেই অসাধারণ ব্যাপারটা টের পায় না। এর নামই হয়তো জীবন। এর নামই হয়তো আধ খানা ভালো ছেলে, আধ খানা মাস্তান। আবরার আতহারের বানানো সঙ্গীত শিল্পী অর্ণবকে নিয়ে মিউজিক্যাল ফিল্মটি কয়েক ঘন্টা আগে মুক্তি পেয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে।

একটু একটু করে অর্ণবের মুখে অগোছালো ভাবে তার নিজের গল্প শুনতে শুনতে আপনি হারিয়ে যাবেন গানে। যে গানগুলো হয়তোবা আগেই আপনার শোনা। যে গানে আপনি মাথা দুলিয়েছেন কিংবা যেসব গানগুলো হুটহাট শুনতে পেয়ে অদ্ভুত আনন্দ হয়েছে। মিউজিকের এই শক্তির ব্যাপারেও ফিল্মে বেশ প্রত্যক্ষভাবে দেখানো হয়েছে। আমাদের জাতির ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে এই গানগুলো। যেগুলো কিছু কিছু সময় প্রেম কিংবা বেদনার সঙ্গী হয়েছে। অথবা একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে নতুন করে জাগিয়েছে এসব গান। সময় পাল্টেছে। গানও পাল্টেছে।

আধ খানা ভালো ছেলে, আধ খানা মাস্তান

অর্ণবের জন্ম হয়েছে। গানের সাথে যোগাযোগ আমাদের থামেনি। এমনই এক স্বচ্ছ ও মসৃণ মিউজিক্যাল ফিল্মটি ‘আধ খানা ভালো ছেলে, আধ খানা মাস্তান’ দেখে নিতে পারেন। যেহেতু আজই বের হলো, তাই গরম গরম দেখে নিন। অর্ণবের সঙ্গে এক সন্ধ্যা কাটিয়ে দিচ্ছেন বলেই মনে হবে।মাত্র সত্তর মিনিটে একজন মানুষের জীবনের হয়তো কিয়দাংশও বলা যায় না। মানুষটা যদি শিল্পী হয় তাহলে তার গান, সৃষ্টি নিয়ে কথা বলতে গেলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় চলে যাবার কথা। অর্ণবের মত একজন ক্লাসিক্যাল, ডুয়াল পার্সোনালিটি সম্পন্ন শিল্পীকে নিয়ে মিউজিক্যাল এক অর্থে তাই ভাল রকম চ্যালেঞ্জ।

সবকিছুর আগে সেই চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য নির্মাতা আবরার আতহারকে ধন্যবাদ জানাই। মিউজিক্যাল ফিল্ম হলেও এটিতে যেহেতু দুই বাংলার স্পন্দনের গান গাওয়া শায়ান চৌধুরী অর্ণবকে নিয়ে নানা ভেতর বাইরের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তাই এটিকে ডকুমেন্টারি ফর্মেটেও ফিল্ম বলা যায়। তবে পুরোটা সময় এটাকে খুব তথ্যে ঘাটা কোন প্রামাণ্যচিত্রর মত লাগেনি, এর একমাত্র কারণ ফিল্ম ডিজাইন। একটা জলসার সেট আপ রেখে অর্ণব তার গল্প, তার দর্শন আর ব্যক্তিত্ব নিয়ে বলে গেছেন অকপটে, লুকোছাপা না রেখে। অন্যদিকে একটার পর একটা গান বেজেছে অর্ণবের দলকে নিয়ে যেখানে ছিলেন স্ত্রী সুনিধিও।

মূলত পাঁচটি বিষয় উঠে এসেছে ফিল্মে। অবশ্যই দশটার ওপর অর্ণবের গাওয়া গান একটা স্পেশাল ব্যাপার ছিল, জলসার সেট ডিজাইনটাও ছিল দারুণ। দ্বিতীয় বিষয় ছিল, অর্ণবের ব্যক্তিজীবন । বাবা মায়ের আলাদা থাকা শৈশব আর হোস্টেল জীবনের গল্প নিজের মুখে বলেছেন অর্ণব। এরপর উঠে এসেছে ঢাকা আর শান্তিনিকেতনের আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্ণবকে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, তার বড় হওয়াটাকে নাড়িয়ে চাড়িয়ে একজন দ্বৈত সত্ত্বার মানুষে রূপ দিয়েছে সেসব কথা। অর্ণব রবীন্দ্রনাথ থেকে আব্বাসউদ্দিন সব গানই গেয়েছেন, বেশিরভাগ ছিল তার মৌলিক গান যার আবার অধিকাংশের লিরিক্স লেখা তার সাবেক সঙ্গীনী সাহানা বাজপেয়ীর।

সঙ্গীদের অবদান বারবার উঠে এসেছে

ফলে ঘুরেফিরে অর্ণবের ব্যক্তিগতজীবনে স্ত্রী, বন্ধু, সঙ্গীদের অবদান বারবার উঠে এসেছে ন্যারেশানে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেই বিষয়টি এই ফিল্মকে অর্থবহ করেছে, পূর্নাঙ্গতা দিয়েছে তা হল সঙ্গীতের শক্তি নিয়ে কথা আর আমাদের জাতিসত্ত্বা ও ক্রান্তিলগ্নে সঙ্গীত কিভাবে প্রেরণা দিয়েছে সেসব কথা। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’, যাদবপুর আন্দোলন থেকে শাহবাগ আন্দোলনে গানের রেশ ফিল্মে বলা হয়েছে বেশ গুছিয়ে, সংশ্লিষ্ট ফুটেজ দিয়ে। যেটি না বললেই নয়, দোষেগুনে অর্ণব একজন শিল্পী , তার চেয়েও স্পেসিফিক সে একজন মানুষ। তার জীবনে উত্থান পতন আর নিজেকে হারিয়ে খোঁজা আর আইডেন্টিটি ক্রাইসিস নিয়ে তার ভাবনাগুলো শুনতে ভাল লেগেছে।

wsrgter

অর্ণব গোছানো নয় বলে কিছুক্ষেত্রে ন্যারেশানে একটা মিশ্র অনুভুতি ছিল আর পুরো ফিল্মে অর্ণবের নিজস্ব সংগ্রামের গল্প খুব গভীরে যাওয়া হয়নি। বাদবাকি হিসাবে ভিন্ন একটা মিডিয়ামে ভাল সময় কেটেছে ‘আধখানা মস্তান’র গল্প শুনে। যারা গান ভালবাসেন তাদের সব বাদ দিলে গান শুনেই পয়সা উসুল হবে, আমি নিশ্চিত!আমি শুধু আমার সাধারণ কিছু অভিজ্ঞতা বলি অর্ণব কী জিনিস তা সম্ভবত যারা তার গানকে ভালোবেসেছে তারাই জানে। একটা সময় ছিলো অর্ণবের নাম শুনলে মুখে হাসি ফোটার আগে চোখ বড় বড় হয়ে যেত।

‘ওমা অর্ণব আসছে?’ এরকম থাকতো বিস্ময়ের সেই অভিব্যক্তি। বড় হতে হতে দেখলাম অর্ণব হারিয়ে যাচ্ছে অথবা গেছে। বড় আপুদের কাছে শুনতাম অর্ণবের গান সরাসরি শুনলে নাকি বুক ধুকপুক করে। কেন করে? সেটা কেউ বলতে পারতো না। আমি অর্ণবকে চিনতাম না। তার গান চিনতাম। আমার এখনও মনে আছে ইউটিউবে যখন প্রথম অর্ণবের কণ্ঠের ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না’ গানটা খুঁজে পেয়েছিলাম কী আনন্দই না হয়েছিলো। অর্ণবের কণ্ঠটা খানিকটা সুরলিস্টিক মনে হয় আমার কাছে। আমি গানের ওত কিছু বুঝি না।

চোখ বন্ধ করলে হুট করে পাল্টে যায়

কিন্তু এটা বুঝি অর্ণবের গান শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ করলে হুট করে পাল্টে যায় সামনের দৃশ্য। আমার সামনে ভেসে ওঠে বৃষ্টিভেজা কোন এক রঙিন শহর। অচেনা কোন বিদেশী কেউ টুপটাপ বৃষ্টিতে গায়ে ওভার কোট চাপিয়ে হেটে যাচ্ছে সামনের দিকে। রঙিন আলোগুলো রাস্তার উপর ভেজা জলে প্রতফলিত হচ্ছে। হুডি চাপিয়ে কেউ হয়তো এই টুপটাপ বৃষ্টিতে ডুব দিতে চাইছে। খুব ডুব! সুনিধি নায়েকের সঙ্গে বিয়ে প্রকাশ্যে আসার আগে সম্ভবত এক দু’বার অর্ণব এবং সুনিধি কিছু অনুষ্ঠানে একসঙ্গে গেয়েছিলেন। অচেনা শাড়ি পরা এক মেয়ে সুনিধি নায়েকের গলায় রবীন্দ্র সঙ্গিত শুনে থ মেরে বসে থাকার কথা মনে পরে।

মোটরসাইকেল ইনসুরেন্স কি ও ইনসুরেন্স করার নিয়ম

মনে পরে বছর দুই আগে একটা শো-তে পাশে বসে সুনিধির কণ্ঠ শুনে স্থির হয়ে বসে থাকা অর্ণবের মুখ। পর পর দু’জনের গান শুনলে কেন যেন শুধু কান্না পায়। এই দিন দুনিয়া খুব হালকা ও ফাঁকা মনে হয়। এই অনুভূতি অন্য কারও হয় কিনা জানি না। অর্ণবের গান কত সিনেমায় শুনেছি। বারবার ফাঁকা অনুভব করেছি বুকের মাঝে। সম্প্রতি চরকি তাকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিক্যাল ফিল্ম তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। তৈরি হয়ে এখন সেটি প্রচারের অপেক্ষায়। আজ দেখলাম এই মাসের ২৩ তারিখই সম্ভবত রিলিজ দেবে। প্রথম আলোতে পড়লাম এই ফিল্মে অর্ণবের ১২টা গান আছে।

আমি জানি না এই গানগুলো শুনলে সেই আগের মত ফাঁকা অনুভব করবো কিনা। কিন্তু অর্ণবকে নিয়ে একটি মিউজিক্যাল ফিল্ম হতে পারে এটা ভাবতে যে, ২০২১ অব্দি আসতে হলো সেটা ভেবেই একটু মন খারাপ হয়েছে। ‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মাস্তান’ নামটার মধ্যেও কাব্যময়তা আছে। শুনলে আপনি হাসতে পারেন কিন্তু অর্ণবের নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছে এই ফিল্মের নাম ‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মাস্তান’ বাক্যটাও মনে হয় অর্ণবের কণ্ঠে শুনলে গান মনে হবে। মিউজিক্যাল ফিল্ম আমাদের বাংলাদেশে খুব বেশি হয় না বললেই জানি।

বেশ কয়েক বছর আগে একটা মিউজিক্যাল ফিল্ম দেখার জন্য উন্মুখ ছিলাম। নাম না উল্লেখ করেই দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এক সপ্তাহও হলে চলার মত ফিল্ম ছিলো না সেটি। কিন্তু অর্ণবের উপর তৈরিকৃত মিউজিক্যাল ফিল্ম নিয়ে আশাবাদী না হয়ে পারা যায় না। অর্ণব নামের আবেগে গানের সঙ্গে এখন যে ফিল্মেরও ছোঁয়া লাগবে, সেটা ভাবতেই অদ্ভুত ভালো লাগে। ফিল্মের পোস্টারটিতে অর্ণবের ছবিটাকে পরাবাস্তব উপায়ে দেখানো হয়েছে, বিশ্বাস করুন চোখ বন্ধ করে অর্ণবের গান শুনলে এরকমটাই অনুভূতি হয়। এ যেন এক সুরিলিস্টিক সুর!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *